রাজনৈতিক সংস্কারে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে। সোমবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ১৭তম দিনের দ্বিতীয় পর্বের সংলাপে প্রস্তাব পাস হয়েছে—একই ব্যক্তি দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্তে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রাজনৈতিক দল সম্মতি জানিয়েছে।
যেসব দল ভিন্নমত পোষণ করছে, তারা চাইলে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আকারে মত প্রকাশ করতে পারবে।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানান, সংলাপে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল—
1. এক ব্যক্তির একাধিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদে থাকা
2. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো
3. সাংবিধানিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি
আলোচনায় অধিকাংশ দল একমত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শুধু সংসদীয় নেতা থাকতে পারবেন, কিন্তু দলীয় প্রধান হওয়া উচিত নয়। সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে অংশগ্রহণকারী জোট ও দলগুলোর বৃহৎ অংশ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে দলগুলো একটি যৌক্তিক কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নেয়। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন গঠনের জন্য প্রধান উপদেষ্টা মনোনয়ন দেবেন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সার্চ কমিটি। রাষ্ট্রপতিকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার বিষয়ে বেশিরভাগ দলের সম্মতি মিলেছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, নতুন কাঠামোতে বিচার বিভাগও সংশ্লিষ্ট থাকবে না। যদিও জামায়াতে ইসলামী একমাত্র দল হিসেবে বিচার বিভাগের সম্পৃক্ততার প্রস্তাব দিয়েছিল, তারা জানায়—বহুমতের প্রতি সম্মান রেখেই তারা অংশ নেবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সার্চ কমিটিতে থাকবে—
সরকারি দলের ২ জন
বিরোধী দলের ২ জন
সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের ১ জন
অন্যান্য দলের ১ জন করে মনোনয়ন প্রস্তাবের সুযোগ
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেও একজন করে নাম প্রস্তাবের সুযোগ থাকবে। ঐকমত্য পেলে এ কমিটি থেকেই প্রধান উপদেষ্টার নাম উঠে আসবে।
বিএনপি'র সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন। ১২৩(৩) ধারা অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষের আগে নির্বাচন হলেও বর্তমান সংসদ বহাল থাকে—এ বিধান সংস্কারের ওপর জোর দেন তিনি।
জামায়াত'র নায়েবে আমির ডা. তাহের বলেন, কেয়ারটেকার সরকার গঠনে দলগুলোর প্রস্তাবকে একীভূত করে যৌক্তিক কাঠামো তৈরি সম্ভব।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি'র ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, সরকারপ্রধান ও দলীয় প্রধানের পদ বিভাজন করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সিপিবি ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি'র মতে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিচার বিভাগের সম্পৃক্ততা ছাড়া, নিরপেক্ষভাবে এই কাঠামো গঠনের আহ্বান জানান।
কমিশনের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন:
বিচারপতি মো. এমদাদুল হক
ড. ইফতেখারুজ্জামান
ড. বদিউল আলম মজুমদার
সফর রাজ হোসেন
ড. মো. আইয়ুব মিয়া
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার
এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে অংশ নেয় ৩০টি রাজনৈতিক দল, যার মধ্যে রয়েছে—
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণ-অধিকার পরিষদ, গণ-সংহতি আন্দোলন, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, আরও অনেক দল ও জোট।