Home বাংলাদেশ ঘটনা-দুর্ঘটনা কেউ দিচ্ছেন রক্তের জোগান, কারো হাতে পানি-স্যালাইন

কেউ দিচ্ছেন রক্তের জোগান, কারো হাতে পানি-স্যালাইন

Posted by on in বাংলাদেশ 0
1st Image

২০২৪ সালের এক শোকাবহ সোমবারে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমানের দুর্ঘটনায় যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা সমগ্র জাতিকে নাড়া দিয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই এক অসাধারণ চিত্র ফুটে উঠেছে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও আশপাশের সড়কগুলোতে—স্বেচ্ছাসেবীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও মানবিক সহায়তায়।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সামনের সড়কে গত কয়েক দিন ধরে অবিরত দাঁড়িয়ে আছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। তাদের কেউ সংগঠনের হয়ে, কেউবা একেবারে ব্যক্তিগতভাবে দুর্ঘটনায় আহতদের পরিবারকে পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন। হাসপাতালের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ভেতরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই স্বেচ্ছাসেবীরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে রেখেছেন।

দগ্ধ শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে কয়েকটি সংগঠন নিজস্ব হেল্প ডেস্ক স্থাপন করেছে। বিশেষ করে বিরল রক্তের গ্রুপের রোগীদের জন্য স্বেচ্ছাসেবীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে রক্তদাতা সংগ্রহ করছেন। কারও রক্ত দরকার হলেই ঠিক যেন ছুটে আসছেন তারা, সঙ্গে করে নিয়ে আসছেন স্যালাইন, বিশুদ্ধ পানি, এমনকি দুপুরের খাবারও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা এখানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হেল্প ডেস্ক বসিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোগীর স্বজনদের পাশে ছিলেন। তারা জানিয়েছেন, শুধু গতকালই প্রায় ২০ জন স্বজনকে খাবার ও চিকিৎসা–সংশ্লিষ্ট সহায়তা দিয়েছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের এক নেতা জানান, তারা বাইক সার্ভিস পর্যন্ত দিচ্ছেন, যেন রক্ত সংগ্রহ বা মেডিকেলের মধ্যে যাতায়াত দ্রুততার সঙ্গে করা যায়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা পড়ছে নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপের রক্তের।

বিমান দুর্ঘটনার পরপরই সাড়া দিয়ে মাঠে নামে ‘তাকওয়া চ্যারিটি ফাউন্ডেশন’। এই সংগঠনটি আহতদের রক্তদানে সহায়তা, হাসপাতালে দ্রুত স্থানান্তর এবং উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাদের প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা জরুরি সহায়তায় এক অভূতপূর্ব উদাহরণ গড়ে তুলেছেন।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক পর থেকেই সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের ৩০ জনের একটি যুব স্বেচ্ছাসেবক দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আহতদের উদ্ধার এবং হাসপাতালে প্রেরণে সহায়তা করে। তারা শুধু দুর্ঘটনাস্থলে নয়, বিভিন্ন হাসপাতালে আলাদা আলাদা দল গঠন করে রক্ত সংগ্রহের কাজেও নেমে পড়েছে।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতাল এবং বিএসএমএমইউতে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীরা সক্রিয়ভাবে রক্তদাতা ব্যবস্থাপনা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও মনো-সামাজিক সহায়তা প্রদান করছেন।

রক্তসংগ্রহ কার্যক্রমে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে ‘মঙ্গল আলোয় ফাউন্ডেশন’। এ পর্যন্ত সংগঠনটি প্রায় ৭০০ জন রক্তদাতা সংগ্রহ করেছে, যাদের মধ্যে অন্তত ২০ জন ইতিমধ্যে বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রোগীদের রক্ত দিয়েছেন। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান নার্গিস সুলতানা জানান, তারা প্রতিনিয়ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন যাতে দ্রুত প্রয়োজনে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া যায়।

রাজনৈতিক বা সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসেছেন। কেরানীগঞ্জ থেকে আসা হাসান মাহমুদ নামে একজন যুবক নিজস্ব মোটরসাইকেল নিয়ে সকাল ৭টা থেকে ইনস্টিটিউটের সামনে অপেক্ষা করছেন, যদি কাউকে রক্ত, খাবার বা যাতায়াতে সাহায্য করতে পারেন। হাসানের মতো অনেকেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, সহানুভূতি ও মানবিকতা দল বা সংগঠনের সীমানায় আটকে নেই।

হাসপাতাল এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে নিশ্চিত করছেন—শুধুমাত্র রোগীর স্বজন ও দায়িত্বপ্রাপ্তরাই ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন।

সেবা যোগাযোগ নম্বর
রেড ক্রিসেন্ট রক্ত কেন্দ্র (মোহাম্মদপুর) ০১৮১১৪৫৮৫৩৭
রেড ক্রিসেন্ট রক্ত কেন্দ্র (হলিফ্যামিলি হাসপাতাল) ০১৮১১৪৫৮৫৩৬
মঙ্গল আলোয় ফাউন্ডেশন (রক্ত/সহায়তা) [অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজ/ইনবক্স]

মানুষের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তগুলোতে পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতা। উত্তরার এই দুর্ঘটনায় আমরা দেখেছি—রাজনৈতিক পরিচয়, শ্রেণিভেদ, বা পেশাগত পার্থক্য ভুলে একেকজন মানুষ কীভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন অন্যের পাশে দাঁড়াতে। এটিই এক জাতির চেতনার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।

সাময়িক দুঃখের অন্ধকারেও আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি—যেখানে মানুষ মানুষের জন্য, যেখানে সহানুভূতির হাত ছুঁয়ে যাচ্ছে শত শত আহত প্রাণকে।