গত কয়েকদিন ধরে দেশের মানুষ ছিল ভ্যাপসা গরমের জ্বালায় অতিষ্ঠ। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দিনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে অস্বাভাবিক গরম আর অস্বস্তিকর আদ্রতায়। তবে বুধবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া একটানা বৃষ্টিপাতের ফলে প্রকৃতি যেন একটু পরম শান্তির পরশ ছুঁয়ে দিয়েছে।
বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ এলাকাতেই বৃষ্টির দেখা মিলেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ফেনীতে সর্বোচ্চ ১৬৮ মিলিমিটার, কুমিল্লায় ১১৪ মিলিমিটার, ভোলায় ১০১ মিলিমিটার, মানিকগঞ্জে ৮৫ মিলিমিটার ও বরিশালে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বৃষ্টির আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচণ্ড গরম অনুভূত হয়েছে। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে বুধবার রেকর্ড করা হয় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ছিল দেশের সর্বোচ্চ। এছাড়া দেশের অধিকাংশ জেলাতেই তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রির উপরে ছিল। তবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আবহাওয়ার কিছুটা পরিবর্তন শুরু হয়, আর বিকেলের দিকে আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তনের পূর্বাভাসও মিলেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তার আশেপাশের এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা দ্রুত ঘনীভূত হয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকাগুলোর উপর ভারী বর্ষণের প্রভাব ফেলতে পারে। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ তরিকুল নেওয়াজ কবির বলেন, “বুধবার রাতের বৃষ্টির পর মেঘমালা উত্তর দিকে সরে গেলেও সকালেই বঙ্গোপসাগরে নতুন লঘুচাপ তৈরি হয়, যা দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের উপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।”
আবহাওয়া অফিস আরও জানায়, মৌসুমি বায়ুর অক্ষ রাজস্থান থেকে বিহার হয়ে পশ্চিমবঙ্গ, তারপর লঘুচাপ কেন্দ্র হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অক্ষের প্রভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় এবং অন্যত্র মোটামুটি সক্রিয় রয়েছে। ফলে শুক্রবার থেকেই সারাদেশে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক জানান, “যেহেতু সাগরে একটি সক্রিয় লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে, তাই শুক্রবার থেকে উপকূলীয় অঞ্চলসহ প্রায় সব জেলাতেই বৃষ্টি হতে পারে এবং এই ধারা ২৮ জুলাই পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।”
বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (BWOT) তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, এটাই চলতি বছরের নবম এবং পঞ্চম মৌসুমি বৃষ্টির বলয়। এটি ২৪ জুলাই চট্টগ্রাম দিয়ে প্রবেশ করেছে এবং ২ আগস্ট রংপুর দিয়ে দেশ ছাড়তে পারে। প্রথম ধাপে আগামী ২৪–৩৬ ঘণ্টার মধ্যে দেশের ৬০–৭০ শতাংশ এলাকায় সক্রিয় হবে এই বৃষ্টি বলয়, আর এরপর তা পুরো দেশের উপর বিস্তৃত হতে পারে।
| বৃষ্টিপাত (২৪ ঘণ্টায়) | শ্রেণি |
|---|---|
| ১–১০ মিমি | হালকা বৃষ্টি |
| ১১–২২ মিমি | মাঝারি বৃষ্টি |
| ২৩–৪৩ মিমি | মাঝারি ভারী বৃষ্টি |
| ৪৪–৮৮ মিমি | ভারী বৃষ্টি |
| ৮৮ মিমির বেশি | অতিভারী বৃষ্টি |
| তাপমাত্রা (ডিগ্রি সেলসিয়াস) | তাপপ্রবাহের শ্রেণি |
|---|---|
| ৩৬–৩৭.৯ | মৃদু তাপপ্রবাহ |
| ৩৮–৩৯.৯ | মাঝারি তাপপ্রবাহ |
| ৪০–৪১.৯ | তীব্র তাপপ্রবাহ |
| ৪২ এর বেশি | অতি তীব্র তাপপ্রবাহ |
যারা প্রতিদিন ঘর থেকে বেরিয়ে জীবন ও জীবিকার জন্য ছুটছেন, তাদের জন্য এই বৃষ্টি যেন আর্শীবাদস্বরূপ। রাস্তার নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, কৃষক কিংবা হকার—সবাই বলছেন, গত কয়েকদিনের অস্বস্তিকর গরমের পর এই স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া যেন তাদের জীবনে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বরাবরই চমকপ্রদ। হঠাৎ তাপপ্রবাহের পর হঠাৎ বৃষ্টি—এটাই যেন আমাদের পরিচিত ছন্দ। আবহাওয়ার এমন পালাবদলে কিছুটা হলেও স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যদি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টি চলমান থাকে, তাহলে আগামী কয়েকদিন দেশের আবহাওয়া অনেকটাই সহনীয় থাকবে বলেই আশা করা যায়।