দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এপ্রিল থেকে জুন মাসে ব্যাংকটির সম্মিলিত লোকসানের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৭৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি। এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর ওয়েবসাইটে।
ব্যাংকটি বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে, অতিরিক্ত পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে তারা ঋণের বিপরীতে সুদ আয় হিসাবভুক্ত করতে পারেনি। অনেক ঋণ এখন কার্যত অনাদায়ী হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি, তারল্য সংকট মোকাবিলায় উচ্চ সুদে আমানত গ্রহণ করতে হচ্ছে, ফলে আমানতের সুদ ব্যয়ও বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে লোকসানের বোঝা আরও ভারি হয়েছে।
শেয়ারপ্রতি লোকসান (EPS): দ্বিতীয় প্রান্তিকে দাঁড়িয়েছে ২.৩৭ টাকা, যেখানে আগের প্রান্তিকে ছিল ০.৫১ টাকা।
নগদ অর্থপ্রবাহ: ছিল নেতিবাচক ৯.২৬ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় আরও খারাপ।
৩০ জুন পর্যন্ত নিট দায়: শেয়ারপ্রতি ছিল ১.১৯ টাকা।
বর্তমানে ব্যাংকের শেয়ারের ১৫.৫৪% রয়েছে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে, ৩৮.২৩% প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, ০.৩৬% বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এবং ৪৫.৮৭% সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।
দেশীয় আর্থিক খাতে নানা অনিয়ম ও বিতর্কিত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকের পুরনো পর্ষদ বিলুপ্ত করে নতুন পর্ষদ গঠন করে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন উদ্যোক্তা পরিচালক এবং বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বেও ব্যাংকের লোকসান থামেনি—বরং বাড়ছে প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় সিকদার পরিবার। চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার পরিবারভুক্ত সদস্যদের নিয়ে পর্ষদ পুনর্গঠন করেন। শুরু হয় বেনামি ঋণ বিতরণ, অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং নিয়ম ভঙ্গের ধারাবাহিকতা। এরই ধারাবাহিকতায়:
২০২২ সালে ব্যাংকের রেকর্ড ৩,২৬১ কোটি টাকার লোকসান, দেশের ব্যাংক খাতে একক সর্বোচ্চ।
২০২৩ সালে লোকসান ছিল ১,৪৯৭ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই লোকসান পৌঁছায় ১,৭০৬ কোটি টাকায়।
খেলাপি ঋণও বাড়তে বাড়তে এখন দাঁড়িয়েছে ২৭,৩৫২ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৬৪ শতাংশ। এক সময় যার পরিমাণ ছিল মাত্র ৪০০ কোটি টাকার নিচে।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ন্যাশনাল ব্যাংকের অবস্থার অবনতি হয়। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুর মেলানোয় সিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণ সহজে ভাঙেনি। এর ফলেই ব্যাংকটি ক্রমাগত লোকসানে ডুবে যেতে থাকে।