এক বছর আগে দেশে ঘটে যাওয়া ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানের বার্ষিকী ঘিরে সরকার ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ নামের একটি রাজনৈতিক দলিল প্রকাশের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে। আগামী ৫ আগস্ট বিকাল ৫টায় এই ঘোষণা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক—এই গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরিতে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের মতামত নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রমতে, ২৬ দফা সম্বলিত এই ঘোষণাপত্রে অংশ নিয়েছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দল, যাদের মধ্যে রয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি। অন্যদিকে, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণফোরামসহ বেশ কয়েকটি দল জানিয়েছে, তাদের কোনো মতামত চাওয়া হয়নি, এমনকি খসড়া ঘোষণাপত্রও তাদের হাতে পৌঁছায়নি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই এই ধরনের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হলে, তা জাতীয় ঐক্যের দলিল নয় বরং সরকারের নিজস্ব অবস্থান বলেই প্রতীয়মান হবে।” গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, “ছোট হোক বা বড়, সব রাজনৈতিক দলকেই গুরুত্ব দিয়ে এই ধরনের ঘোষণাপত্রে সম্পৃক্ত করা জরুরি। অন্যথায়, ভবিষ্যতে তা বিভেদ তৈরি করবে।”
গণঅধিকার পরিষদের নেতা শাকিল-উজ জামান বলেন, তাদের দলকে সম্পৃক্ত না করেই প্রক্রিয়া এগোনো হয়েছে। রবিবার একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে তাদের দলীয় অবস্থান তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, জানুয়ারির শেষ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি খসড়া তাদের কাছে পাঠানো হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারিতে তারা মতামত জমা দেন। এরপরও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় দলটি বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করছে।
জামায়াতে ইসলামির নায়েবে আমীর ডা. তাহের বলেন, "সরকার যখন ঘোষণাটি প্রকাশ করবে, তখন আমরা আমাদের অবস্থান জানাবো। এখন মন্তব্য করা সঠিক হবে না।"
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ঘোষণাপত্রে মোট ২৬টি দফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথম ২১টি দফায় দেশের মুক্তিযুদ্ধ, অতীত আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে। বাকি ৫টি দফায় রয়েছে—গণতান্ত্রিক সংস্কার, মানবাধিকার, গুম-খুন-নিপীড়নের বিচার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং একটি নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের প্রত্যয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় ঐক্য ছাড়া কোনো ঘোষণাপত্রই কার্যকর বা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। ‘জুলাই সনদ’ নামের যে নথি ঘোষণার দাবি উঠেছে, তা নিয়েও এখন পর্যন্ত পরিষ্কার কোনো অবস্থান নেয়নি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, ৫ আগস্টের মধ্যেই এই সনদ প্রকাশ করতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “সরকার যদি সত্যিই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তবে ঐকমত্য ছাড়া কোনো দলিল সামনে আনা উচিত হবে না।” তিনি আরও যোগ করেন, “নোট অব ডিসেন্ট ইস্যু নিয়ে কমিশনের এখনো কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেই।”
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ডিসেম্বরে একটি রাজনৈতিক জোট ঘোষণাপত্র প্রকাশের ঘোষণা দেয়, যেখানে বলা হয়—এই দলিলের মাধ্যমে দেশের সংবিধান সংস্কার এবং আওয়ামী লীগকে ইতিহাস থেকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ করে তোলা হবে।
শুরুতে সরকার এ ব্যাপারে নীরব থাকলেও পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের দায়িত্ব নেয়। চলতি বছরের জুলাই মাসেই একাধিক রাজনৈতিক দলের কাছে এই খসড়া পাঠানো হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় সকল পক্ষের উপস্থিতিতে ঘোষণা উপস্থাপন করা হবে। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও একই বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “জুলাই ঘোষণাপত্র এখন আর স্বপ্ন নয়—এটি বাস্তবতা। এটা জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অংশগ্রহণমূলক পন্থা ছাড়া এই ঘোষণাপত্র রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সময় এসেছে সরকারসহ সকল পক্ষকে সত্যিকারের জাতীয় ঐক্যের পথে হাঁটার।