ঢাকার টিকাটুলিতে অবস্থিত ঐতিহাসিক স্থাপনা 'রোজ গার্ডেন' নামে পরিচিত বাড়িটি নিয়ে উঠে এসেছে গুরুতর অভিযোগ—যেখানে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে ব্যক্তি বিশেষের অভিপ্রায় বাস্তবায়নের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অভিযোগ উঠেছে, সম্পত্তি ক্রয়, দলিল প্রক্রিয়া ও অর্থ ছাড়—সব কিছুতেই নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত ও প্রভাব খাটানো হয়েছে, যার পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছাই ছিল মূল চালিকা শক্তি।
সরকারি আইন উপেক্ষা করে সম্পত্তি কেনা
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, ব্যক্তিমালিকানাধীন 'রশিদ মঞ্জিল' নামের একটি বাড়ি রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করে সেটিকে 'রোজ গার্ডেন' নামে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় একদিকে আইন, অন্যদিকে নিয়মনীতি—দুই-ই লঙ্ঘিত হয়েছে।
গণপূর্ত, সংস্কৃতি ও আইন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে বাড়িটির প্রকৃত মূল্য ১০৫ কোটি টাকা হলেও সেটি শেষ পর্যন্ত ৩৩১ কোটি টাকার বেশি দামে কেনা হয়। তদুপরি, মালিককে গুলশানে ২০ কাঠার সরকারি জমিও বিনিময়ে দেওয়া হয়।
মূল্য নির্ধারণে ‘ইচ্ছাপূরণ’ নীতি
প্রাথমিকভাবে ভূমি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের কাজ হলেও, বাড়ির মালিকের আপত্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মূল্য ক্রমাগত বাড়ানো হয়। নথিপত্র বলছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এই বাড়ির মূল্যে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের ‘মৌখিক অনুমোদন’ ও ভেটিং এড়ানো
অভিযোগ রয়েছে, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং কমিটি প্রস্তাবটি আইনবিরুদ্ধ মনে করলেও তাদের মতামত উপেক্ষা করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মৌখিকভাবে অনুমোদন দেন। যা নোট শিটে ‘ঊর্ধ্বতন নির্দেশনার ভিত্তিতে’ উল্লেখ করা হয়।
এক আইন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরনের সম্পত্তি অধিগ্রহণ সাধারণত রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেই হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ‘প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা’কে প্রধান ভিত্তি করা হয়, যা আইনত প্রশ্নবিদ্ধ।
রোজ গার্ডেন না, ‘রশিদ মঞ্জিল’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বাড়ির প্রকৃত নাম ‘রশিদ মঞ্জিল’, যা নির্মাণ করেছিলেন হুমায়ুন রশিদ। পরে এই বাড়িকে ‘রোজ গার্ডেন’ নাম দেওয়া হলেও এলাকাবাসী এখনো সেটিকে হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি বলেই জানেন।
পুরনো বাসিন্দা বদরুল আলম বলেন, “রোজ গার্ডেন তো পরে বানানো নাম। এটি আমাদের কাছে হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি হিসেবেই পরিচিত।”
এক ঐতিহাসিক নাম দিয়ে বাজেটের অপব্যবহার
গণভবনে এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা নিজে রোজ গার্ডেন কেনার ঘটনাকে যুক্ত করে বলেন, “১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ গঠনের সূচনা এখানেই হয়েছিল। এই ইতিহাস বিলীন হওয়া উচিত নয়।” কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, এটি এক ধরনের ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে সম্পত্তি দখলের একটি প্রকল্প।
১০০১ টাকায় দলিল হস্তান্তর!
তথ্য অনুযায়ী, ৩৩১ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের পর রোজ গার্ডেন বাড়িটি মাত্র ১০০১ টাকায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর সেই বাড়িকে ভাগ করে দেওয়া হয় জাতীয় জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমি এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মধ্যে।
স্মৃতিচিহ্ন উধাও, সংস্কারের নামে প্রলেপ
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর রোজ গার্ডেন থেকে সব আওয়ামী লীগ-সম্পর্কিত চিহ্ন সরিয়ে ফেলা হয়। বর্তমানে সেখানে সংস্কারের কাজ চলছে এবং এটি একটি ‘ঢাকা জাদুঘর’ হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা আছে।