ওয়াশিংটন ডিসিতে গতকাল সোমবার ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সম্ভাব্য সমাধানের পথ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং ইউরোপের সাত দেশের নেতাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে ছিল ব্যাপক আগ্রহ।
নতুন পোশাকে জেলেনস্কি
জেলেনস্কি বরাবরই সামরিক পোশাকের মতো পোশাক পরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে হাজির হন। তবে এবার হোয়াইট হাউসে তিনি অনেকটা আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে আসেন। এক ইউরোপীয় কূটনীতিক তাঁর পোশাককে ‘প্রায় স্যুট’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি কালো জ্যাকেট, কলারসহ পোশাক পরেছিলেন, যদিও টাই পরেননি। এতে তাঁর লুকে যেমন সামরিক আবহ রয়ে গেছে, তেমনি ছিল আনুষ্ঠানিকতার ছোঁয়া।
ফেব্রুয়ারির বৈঠকে পোশাকের কারণে ট্রাম্পের অসন্তুষ্টির মুখে পড়েছিলেন জেলেনস্কি। এবার তিনি সেই ভুল পুনরাবৃত্তি করেননি। বৈঠকে প্রবেশ করার সময় এক সাংবাদিক তাঁকে ‘দারুণ লাগছে’ বললে ট্রাম্পও সেই মন্তব্যের সঙ্গে সায় দেন।
কৃতজ্ঞতার ঝড়
ফেব্রুয়ারির বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স অভিযোগ করেছিলেন, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার জন্য যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবার জেলেনস্কি প্রায় প্রতিটি বক্তব্যেই ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন।
ওভাল অফিসে বৈঠকের শুরুতে তিনি মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ট্রাম্পকে চারবার ধন্যবাদ জানান। এরপর তাঁর বক্তব্যে তিনি একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ এবং সমর্থনকারী দেশগুলোকেও ধন্যবাদ দেন।
জেলেনস্কি বলেন, “প্রেসিডেন্ট, এই যুদ্ধ থামাতে আপনার প্রচেষ্টা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আপনার মনোযোগ ও অবদানের জন্য ধন্যবাদ।”
বৈঠকের পরিবেশ ও মূল আলোচনা
বৈঠকে অংশ নেন ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধি। উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও। বৈঠকের পরিবেশ ছিল উষ্ণ, তবে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন, যদি কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে।
তবে ভূমি বিনিময়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো মূল বিষয়ে কোনো পক্ষই স্পষ্ট অবস্থান পরিবর্তন করেনি।
বৈঠক শেষ করেন ট্রাম্প, যেখানে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরেকটি বৈঠকের ঘোষণা দেন।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে মতপার্থক্য
বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে—যুদ্ধবিরতি।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস বলেন, “আমরা সবাই চাই যুদ্ধবিরতি। সেটি ছাড়া নতুন কোনো বৈঠক কল্পনা করা যায় না।”
ট্রাম্প পাল্টা যুক্তি দেন, তিনি অতীতেও যুদ্ধবিরতি ছাড়া অনেক সংঘাতের সমাধান করেছেন। তাঁর মতে, সরাসরি শান্তিচুক্তির দিকে এগোনোই বাস্তবসম্মত পথ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও প্রতিশ্রুতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বৈঠকে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর কোনো প্রস্তাব দেননি। এতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়।
পরিবর্তে, ট্রাম্প ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, এটি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নিজস্ব বাহিনী দিয়ে শান্তিরক্ষা মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের সম্ভাবনা
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি শিগগিরই পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপ করবেন এবং একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করবেন। সময় ও স্থান পরে নির্ধারণ করা হবে।
হোয়াইট হাউসে উপস্থিত ইউরোপীয় নেতারা এটিকে পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, শান্তি প্রক্রিয়ার সামনে এখনও জটিলতা রয়ে গেছে।