বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো মনে করছে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য ঘোষিত সময়সীমা ২০২৬ সালের বদলে ২০৩২ সাল পর্যন্ত বাড়ানো জরুরি। তাঁদের যুক্তি, সফল ও টেকসই উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় অপরিহার্য। এ সময় ব্যবসায়ীরা ৩ বছর গ্রেস পিরিয়ড এবং ৩ বছর ট্রানজিশন পিরিয়ড রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।
রোববার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে “এলডিসি থেকে উত্তরণ: আগামীর চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি), এফবিসিসিআই এবং জাতীয় পর্যায়ের অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠন।
আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণের পক্ষে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বাজার প্রতিযোগিতা বিবেচনায় অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় অত্যন্ত জরুরি। এজন্য আমরা ২০৩২ সাল পর্যন্ত উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, ৩–৫ বছরের বাড়তি সময় পেলে—
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, আসিয়ান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করা সম্ভব হবে।
ওষুধ, আইটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল ও চামড়াশিল্পে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনা যাবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যাবে, যারা অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করবে।
গুণগত মানসম্পন্ন বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে কয়েকটি বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে—
1. শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে ১২% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে রপ্তানি ৬–১৪% কমে যেতে পারে।
2. বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশেষ সুবিধার অবসান: রপ্তানিতে ভর্তুকি, মেধাস্বত্বে শিথিলতা আর পাওয়া যাবে না। এতে ওষুধ শিল্পের খরচ বেড়ে যাবে।
3. পেটেন্ট আইন কঠোর হওয়া: ক্যান্সার, এইচআইভি ও অন্যান্য গুরুতর রোগের ওষুধের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।
4. রুলস অব অরিজিন কঠোর হওয়া: বিশেষ করে পোশাকশিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ৯৮% ওষুধের চাহিদা দেশেই পূরণ করছে এবং ১৫০টির বেশি দেশে রপ্তানি করছে। তবে এলডিসি সুবিধা শেষ হলে ওষুধ উৎপাদনের খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে। যেমন—
ক্যান্সারের ওষুধ ইমাটিনিব, যেটি এখন মাসে ৩০–৪০ ডলারে পাওয়া যায়, সেটি বেড়ে ২,০০০–৩,০০০ ডলার হতে পারে।
এইচআইভি ওষুধ বছরে ১০০–১৫০ ডলার থেকে বেড়ে ১০–১২ হাজার ডলার হতে পারে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮১% আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে শুল্ক সুবিধা হারালে এই খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। উৎপাদন খরচ বাড়বে, প্রতিযোগিতা কঠিন হবে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতে বৈচিত্র্য আনাই একমাত্র টেকসই সমাধান।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন—
এ. কে. আজাদ (সহ-সভাপতি, আইসিসিবি)
কামরান টি. রহমান (সভাপতি, এমসিসিআই)
রাজীব এইচ চৌধুরী (সিনিয়র সহ-সভাপতি, ডিসিসিআই)
মাহমুদ হাসান খান (সভাপতি, বিজিএমইএ)
মোহাম্মদ হাতেম (সভাপতি, বিকেএমইএ)
শওকত আজিজ (সভাপতি, বিটিএমএ)