Home বাংলাদেশ ঘটনা-দুর্ঘটনা পাইলট তৌকির দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন

পাইলট তৌকির দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন

Posted by on in বাংলাদেশ 0
1st Image

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর তরুণ পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম সাগরের জীবনের প্রথম একক (সলো) প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ অভিযান। রাজশাহী শহরের উপশহরের এক ভাড়া বাসা থেকে পরিবারের স্বপ্ন নিয়ে আকাশে উড়েছিলেন তিনি। কিন্তু উড্ডয়নের মাত্র ১২ মিনিট পরেই যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিধ্বস্ত হয় তার নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধবিমানটি।

চীন নির্মিত এফ–৭ বিজিআই মডেলের প্রশিক্ষণ বিমানটি কুর্মিটোলায় অবস্থিত এ কে খন্দকার ঘাঁটি থেকে সোমবার দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়ন করে। আকাশে উড়তে উড়তেই কিছু সমস্যার আভাস পান পাইলট তৌকির। কন্ট্রোল রুমে দ্রুত বার্তা পাঠিয়ে জানান, বিমানটি ভারসাম্য হারাচ্ছে। তখনই ইজেক্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিমানটিকে জনবহুল অঞ্চল থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান।

কিন্তু তার সব চেষ্টা বিফলে গিয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় উত্তরা দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রজেক্ট-২ ভবনের সামনে। তখন সেই এলাকায় চলছিল কোচিং ক্লাস, উপস্থিত ছিল দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। প্রাণ হারান বহু শিশু, আহত হন শিক্ষকসহ আরও অনেকে—দুই শতাধিক হতাহতের হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি নেমে আসে দেশের বুকে।

সলো ফ্লাইট হলো এমন একটি পর্যায়, যেখানে একজন পাইলটকে কোনো প্রশিক্ষক বা কো-পাইলট ছাড়া একা যুদ্ধবিমান চালাতে হয়। অত্যন্ত দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত পাইলটদেরই এমন দায়িত্ব দেওয়া হয়। তৌকির ছিলেন এমনই এক প্রতিশ্রুতিশীল পাইলট। উড্ডয়নের পর ঢাকার বাড্ডা, রামপুরা, হাতিরঝিলের আকাশে চক্কর দিতে থাকেন তিনি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই কন্ট্রোলে সমস্যা টের পেয়ে বিমানটিকে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে চান। কিন্তু দুর্ভাগ্য—কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার এক থেকে দেড় মিনিটের মাথায় দুর্ঘটনাটি ঘটে।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজশাহীর উপশহর এলাকার “আশ্রয়” নামক ভাড়া বাসাটিতে শোকের মাতম শুরু হয়। বাবা তোহরুল ইসলাম, মা সালেহা খাতুন, ও ছোট বোন সৃষ্টি বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়েন। মাত্র ছয় মাস আগে বিয়ে করেছিলেন তৌকির। এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে পরিবারটা যেভাবে সাজানো হচ্ছিল, মুহূর্তেই সবকিছু থেমে যায়।

তৌকিরের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কানসাট এলাকায় হলেও পরিবার নিয়ে রাজশাহীতে বসবাস করতেন। বাবা পাথর ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। বোন সৃষ্টি এমবিবিএস পড়ছেন বারিন্দ মেডিকেল কলেজে। সাগরের পড়ালেখা শুরু রাজশাহী ল্যাবরেটরি স্কুলে, পরে পাবনা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন।

সোমবার বিকেল ৫টার দিকে তৌকিরের বাবা-মা ও বোনকে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নেওয়া হয়। তার চাচা মতিউর রহমান জানান, “আমরা খবর পাই বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে, এরপর থেকে যেন শ্বাসও নিতে পারছি না।”

তৌকিরের মরদেহ রাজশাহী না চাঁপাইনবাবগঞ্জে দাফন করা হবে, তা নিয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে পুরো দেশের হৃদয়ে তিনি রয়ে গেলেন একজন শহীদ বীর হিসেবে, যিনি নিজের জীবন দিয়ে শত শিশুকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।