২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসানে শেখ হাসিনা কুর্মিটোলা বিমানবন্দর দিয়ে দেশত্যাগ করেন—যা ক্যামেরাবন্দি হয়ে মুহূর্তেই ভাইরাল হয় সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু এই একটি ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে যে পর্দার অন্তরালে এমন গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে ছিল, তা তখন কেউই কল্পনা করতে পারেনি।
ভিডিও সূত্র ধরে উন্মোচন হয় ‘র’-এর গোপন জাল
এই দৃশ্য ধারণকারী ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর (RAW) একটি গোপন নেটওয়ার্কের খোঁজ মেলে। গোয়েন্দা তদন্তে উঠে আসে—স্কোয়াড্রন লিডার আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফ ছিলেন ওই নেটওয়ার্কের অন্যতম মূল শাখা।
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করে ডিজিএফআই। পরবর্তীতে কোর্ট মার্শালে ১০ বছরের সাজায় দণ্ডিত হন তিনি এবং বর্তমানে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি সেলে বন্দি আছেন।
ক্যামেরার পেছনের মানুষ: ফ্লাইট লে. রিফাত আশরাফী
কুর্মিটোলা এয়ারবেইসের অফিসার মেস থেকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সেই মুহূর্ত ধারণ করেছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণে মেলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য—আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং ‘র’-এর নির্দেশনা মোতাবেক অপারেশন পরিচালনার আলামত।
ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সুরি, যিনি পরে বলেন, “ওই ভিডিও তো অনেকেই ব্যবহার করে টাকা কামিয়েছেন”—যা বিষয়টিকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।
বাধ্যতামূলক অবসর ও গ্রেপ্তার: সেনা-পুলিশে ঢুকে পড়েছিল গোয়েন্দা হাত
আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আরও ছয়জন উচ্চপদস্থ বিমান কর্মকর্তা ও চারজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় কিংবা স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল, গ্রুপ ক্যাপ্টেন, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ডেপুটি কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
বিশেষভাবে আলোচিত একজন নাম ছিল গুলশান জোনের ডিবি অফিসার ইফতেখার মাহমুদ, যিনি নাকি ‘র’-এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের ‘স্টেশন মাস্টার’ হিসেবে কাজ করতেন। তাকেও কাশিমপুর কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
বাহিনীর ভিতরে বাহিরি প্রভাব: রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিপর্যয়
এই গোটা তদন্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শুধুমাত্র একটি ছবি বা ভিডিও নয়—এর পেছনে কাজ করছিল এক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, যার শিকড় বিস্তৃত ছিল বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তর পর্যন্ত।
এজেন্টদের মধ্যে কেউ পেয়েছেন বিলাসবহুল গাড়ি, আবার কাউকে পাঠানো হয়েছে বিদেশি নারী সঙ্গী। এসব তথ্য গোয়েন্দা তদন্তকে রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো মাত্রা দেয়।
জাতীয় নিরাপত্তার নতুন বাস্তবতা
এই ঘটনা বাংলাদেশে গোয়েন্দা নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। একদিকে যখন সরকার পতনের পর আশা জাগানো পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তখনই এমন একটা নেটওয়ার্ক প্রকাশ্যে চলে আসে, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সূত্র: আমার দেশ