মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন। শুধু রাশিয়াই নয়, যারা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কিনছে, তাদের ওপরও ‘পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা’ আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। মূল লক্ষ্য—রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
আগস্টের শুরুতে ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক আরোপ করেছেন। তাঁর দাবি, রাশিয়ার তেল কেনার শাস্তি হিসেবেই এই পদক্ষেপ। ফলে ভারতের পণ্যে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫০%।
তবে চীনের ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ নেননি ট্রাম্প, যদিও চীনই রাশিয়ার সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা।
চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তারা রাশিয়া থেকে ১০৯ মিলিয়ন টন তেল আমদানি করেছে, যা দেশটির মোট জ্বালানি আমদানির প্রায় ২০%। অন্যদিকে ভারত আমদানি করেছে ৮৮ মিলিয়ন টন—যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে ভারতের আমদানি ছিল প্রায় নগণ্য।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাবিত হয়েছে “স্যানকশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট ২০২৫”। বিলটি পাস হলে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানি অব্যাহত রাখা দেশগুলোর পণ্যে ট্রাম্প চাইলে ৫০০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবেন। বর্তমানে সিনেটররা ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন।
১৫ আগস্ট ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চীনের ওপর একই ধরনের পদক্ষেপ এখনই ভাবছেন না, হয়তো কয়েক সপ্তাহ পর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, বিরল খনিজ নিয়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির সম্ভাবনা রাখতেই ট্রাম্প সময় নিচ্ছেন।
এই খনিজগুলো (১৭টি মৌলিক উপাদান) গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামরিক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে অসংখ্য শিল্পে অপরিহার্য। চীন দীর্ঘদিন ধরেই এই বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রেখেছে। ফলে মার্কিন শিল্প অনেকাংশে চীনা খনিজের ওপর নির্ভরশীল।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে ভারতের আমদানি ছিল ১%–এরও কম, এখন তা বেড়ে ৪২%। তাঁর অভিযোগ, ভারত সস্তা রুশ তেল কিনে প্রক্রিয়াজাত করে অন্য বাজারে বিক্রি করছে এবং এভাবে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে।
হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান স্টিফেন মিলার ও উপদেষ্টা পিটার নাভারো ভারতের এ নীতিকে রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থায়নে সহায়তা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে তাদের বাণিজ্য আন্তর্জাতিক আইনসিদ্ধ কাঠামোর ভেতরে বৈধভাবেই চলছে।
ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি হলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে এবং তা চীনের অর্থনীতির জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে। জুলাই মাসে দেশটির শিল্প উৎপাদন ও খুচরা বিক্রি কমেছে, আর ১৬–২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭.৮%—গত এক বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ।
অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া হেরেরোর মতে, চীন আগেই বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সহজে কার্যকর হবে না। বরং শুল্ক বাড়ালে মার্কিন ভোক্তাদের ওপরই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যঘাটতি ছিল ২৯৫ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬% বেশি। শুল্কযুদ্ধের সময় দুই দেশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে বাণিজ্য প্রায় থমকে যায়।
তবে সম্প্রতি উভয় দেশ কিছুটা ছাড় দিয়েছে। মে মাসে শুল্ক কমানো হয়—মার্কিন শুল্ক ৩০% ও চীনের শুল্ক ১০%–এ নামে। পরে আগস্টে নতুন করে ৯০ দিনের শুল্কবিরতি ঘোষণা করা হয়, যা নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় কোনো নাটকীয় ঘটনা না ঘটলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি সীমিত বাণিজ্যচুক্তি হবে। কারণ, দুই দেশই এখন নিজেদের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে ইতিবাচক বার্তা খুঁজছে।