Home অন্যান্য চাকরি ১ পদের লড়াই ১,৪৩০ জনের! সমাজসেবা অধিদপ্তর নিয়োগে ২১ লাখ আবেদন

১ পদের লড়াই ১,৪৩০ জনের! সমাজসেবা অধিদপ্তর নিয়োগে ২১ লাখ আবেদন

Posted by on in অন্যান্য 0
1st Image

১ পদের জন্য ১,৪৩০ জন! সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগে ২১ লাখের বেশি আবেদন; শ্রমবাজারে ২০ লাখ তরুণের চাপ ও বেকারত্বের ভয়াবহ চিত্র

প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাঁদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ কতটা তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নের মধ্যেই সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতার এক নজিরবিহীন চিত্র সামনে এসেছে। সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি প্রার্থী। অর্থাৎ, একটি পদের বিপরীতে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন প্রার্থী লড়াই করছেন। চাকরির বাজারে নতুন মানুষের চাপ বাড়লেও তাঁদের জন্য কাজের সুযোগ কতটা বাড়ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে রেকর্ড ভাঙা আবেদন

সমাজসেবা অধিদপ্তর ৫২টি ক্যাটাগরিতে ১ হাজার ৪৮৫ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। ২ জুন থেকে ২৩ জুন ২০২৬ পর্যন্ত এই আবেদনের প্রক্রিয়া চলে। আবেদনপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দেখা গেছে, মোট ২১ লাখ ২৩ হাজার প্রার্থী আবেদন জমা দিয়েছেন। পদের ধরন ও যোগ্যতার বিচারে এটি কোনো সাধারণ পরীক্ষা নয়; এখানে এসএসসি থেকে শুরু করে স্নাতক পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের প্রার্থীদের আবেদনের সুযোগ ছিল।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, সবচেয়ে বেশি ৪৭৮টি পদ ছিল অফিস সহায়কের জন্য, যার জন্য কেবল এসএসসি পাস থাকলেই আবেদন করা যেত। এ ছাড়া ৩১২টি ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদসহ শিক্ষক, কম্পিউটার অপারেটর, কারিগরি প্রশিক্ষক ও ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর পদেও নিয়োগের সুযোগ ছিল। এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি এখন নিয়োগদাতা সংস্থার জন্যও একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরীক্ষার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব প্রথম আলোকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থী আবেদন করেছেন। বর্তমানে পরীক্ষা আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং আশা করা হচ্ছে আগামী দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা শুরু হবে।

বিসিএস-এর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি প্রতিযোগিতা

সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই একটি নিয়োগের আবেদন সংখ্যা সাম্প্রতিক বিসিএস পরীক্ষার তুলনায় বহুগুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ৫০তম বিসিএসে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার, ৪৯তম বিসিএসে ৩ লাখ ১২ হাজারের বেশি এবং ৪৭তম বিসিএসে ৩ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। অর্থাৎ, বিসিএস-এর চেয়েও কয়েক গুণ বেশি মানুষ এই একটি অধিদপ্তরের পদের জন্য লড়াই করছে।

অন্যদিকে, সরকারি চাকরিতে শূন্য পদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মোট ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য ছিল, যা পূরণের পরিকল্পনা করছে সরকার।

শ্রমবাজারে নতুন মানুষের চাপ ও কর্মসংস্থানের ব্যবধান

বাংলাদেশের চাকরির বাজারে প্রতিবছর কত মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তা নিয়ে বিশ্বব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। তবে এই ২০ লাখের সবাই সরাসরি চাকরির প্রার্থী নন; কেউ ব্যবসা বা আত্মকর্মসংস্থানে যাচ্ছেন, কেউ প্রবাসে পাড়ি জমাচ্ছেন, আবার কেউ পড়াশোনার কারণে সাময়িকভাবে কর্মক্ষম নয়।

তবে কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছানো তরুণের সংখ্যা এবং নতুন চাকরি তৈরির মধ্যকার ব্যবধানটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছালেও একই সময়ে নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। অর্থাৎ, নতুন প্রার্থীর তুলনায় চাকরির সৃষ্টির গতি অনেক ধীর। আরও আশঙ্কার বিষয় হলো, ওই সময়ে তৈরি হওয়া নতুন কাজের প্রায় ৭০ শতাংশই গেছে নিম্ন-উৎপাদনশীল কৃষি খাতে, যেখানে উল্টো উৎপাদন বা শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমে আসছে।

কেন সরকারি চাকরির পেছনে এই বিপুল ভিড়?

সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের এই আকাশচুম্বী চাহিদার পেছনে কেবল চাকরির স্থায়িত্ব বা নিরাপত্তার বিষয়টি কাজ করছে না; বরং বেসরকারি খাতের নিয়োগের গতি কমে যাওয়া একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রভাবে বেসরকারি খাতে নতুন নিয়োগ কমে যাওয়ায় সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়া মাত্রই আবেদনের জোয়ার তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত ফাইন্যান্স ও ডেভেলপমেন্ট সামালিকীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই নিয়োগে ২১ লাখের বেশি আবেদন পড়া মূলত সেই গভীর অর্থনৈতিক চাপেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। চাকরির প্রার্থী সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, কিন্তু তাঁদের জন্য কাজের সুযোগ কতটা তৈরি হচ্ছে—সেই প্রশ্নটি এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।