Home অন্যান্য ফিচার কচুরিপানায় ঢেকে গেছে গোসাঁইয়ের দহ, অস্তিত্ব সংকটে দেশি মাছ

কচুরিপানায় ঢেকে গেছে গোসাঁইয়ের দহ, অস্তিত্ব সংকটে দেশি মাছ

Posted by on in অন্যান্য 0
1st Image

দেশি মাছের অস্তিত্ব সংকটে গোসাঁইয়ের দহ: কচুরিপানায় ঢেকে গেছে আঁতুড়ঘর, হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ

একসময় যেখানে দেশি মাছের বিপুল সমারোহ আর প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল ‘গোসাঁইয়ের দহ’, আজ সেখানে শুধুই কচুরিপানার সাম্রাজ্য। জলাশয়টির বুকজুড়ে এখন ঘন সবুজ কচুরিপানায় ঢাকা, যার নিচে 숨িয়ে আছে নিঃশব্দে মরে যাওয়া অসংখ্য দেশি মাছের বংশধর। পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা আর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী জলাশয়টি এখন কেবল একটি কচুরিপানার স্তূপ মাত্র।

কচুরিপানার আড়ালে দমবন্ধ করা জীবন

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গোসাঁইয়ের দহ ছিল এলাকার দেশি মাছের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র বা ‘আঁতুড়ঘর’। এখানে প্রচুর পরিমাণে পুঁটি, মলা, ঢেলাসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ ডিম ছাড়ত এবং বড় হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। জলাশয়টির উপরিভাগ এখন ঘন কচুরিপানায় এতটাই ঢাকা যে সূর্যের আলো আর বাতাস নিচে পৌঁছাতে পারছে না।

জলাশয়ের পানির ওপর কচুরিপানার এই পুরু স্তর অক্সিজেনের আদান-প্রদান কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে পানির নিচের স্তরে অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা মাছের বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। এর ফলে প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক প্রজাতির মাছ বংশবিস্তার করতে না পেরে বিলুপ্তির পথে চলে গেছে।

মর্মন্ত হাহাকার স্থানীয় জেলেদের

গোসাঁইয়ের দহ নির্ভর করে এলাকার কয়েকশ মানুষের জীবিকা। কিন্তু বর্তমানে জাল ফেললেই মিলছে কেবল কচুরিপানা আর কাদা। মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলেদের আয় একসময়কার তুলনায় প্রায় অর্ধেক নেমে এসেছে।

জীবিকার সংকটে প্রান্তিক মানুষ

স্থানীয় জেলে রহিম মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "আগে যখন এখানে জাল ফেলতাম, তখন প্রচুর মাছ পেতাম। এখন তো কচুরিপানাই বেশি পাওয়া যায়। মাছের অভাব এত বেড়েছে যে দিন শেষে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।" শুধু জেলেরা নয়, এই জলাশয়টি এলাকার বাস্তুসংস্থানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যা এখন ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে।

কেন এই বিপর্যয়? কারণ ও প্রতিকার

পরিবেশবিদদের মতে, গোসাঁইয়ের দহে এই বিপর্যয়ের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:

  • অনিয়ন্ত্রিত কচুরিপানা বৃদ্ধি: জলাশয়টি নিয়মিত পরিষ্কার না করার ফলে কচুরিপানা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
  • জলাশয়ে বর্জ্য নিক্ষেপ: আশেপাশের এলাকা থেকে আসা আবর্জনা ও পলি জমে জলাশয়ের গভীরতা কমে যাচ্ছে।
  • রাসায়নিক দূষণ: কৃষি জমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক পানিতে মিশে কচুরিপানার অতিবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

উদ্ধার পেতে চাই পরিকল্পিত পদক্ষেপ

গোসাঁইয়ের দহকে পুনরায় তার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন। প্রথমেই জলাশয়টি থেকে অতিরিক্ত কচুরিপানা ও পলি অপসারণ করে খনন কাজ করা দরকার। পাশাপাশি পানির গুণমান বজায় রাখতে এবং মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে একে রক্ষা করতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

যদি এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে গোসাঁইয়ের দহ চিরতরে হারিয়ে যাবে কেবল কচুরিপানার একটি মরা জলাশয় হিসেবে, আর সাথে করে হারিয়ে যাবে এলাকার ঐতিহ্যবাহী দেশি মাছের বিপুল সম্ভারও।