সম্প্রতি সিলেটের সাদাপাথর এলাকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। পাথর লুটের ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে, এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাদাপাথর এলাকা একটি অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্পট, কিন্তু বর্তমানে এর সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে। সিলেটের প্রশাসনের বিরুদ্ধে লুটপাটের সাথে সরাসরি যোগসূত্র থাকার অভিযোগও উঠেছে। প্রশাসন সম্প্রতি সাদাপাথরের পাথর উদ্ধারের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও, এই ঘটনাটি দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সাদাপাথরের পাথর উত্তোলন ও পাচারের ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বেড়ে গেছে। স্থানীয়দের মতে, লুট হওয়া পাথর যদি ফের সঠিক স্থানে ফিরিয়ে না দেওয়া হয়, তবে প্রকৃতির মতো সাজানো সম্ভব হবে না। তাছাড়া, বড় বড় গর্ত খুঁড়ে পাথর উত্তোলন করার কারণে এলাকার পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে এবং মানুষের জন্য মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
গত কয়েক দিনে সিলেটের প্রশাসন এই ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে এবং পাথর পাচার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট জেলা প্রশাসনের তরফে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকের পর সিলেট প্রশাসন একটি যৌথ বাহিনী গঠন করে পাথর লুট বন্ধে অভিযান শুরু করেছে। সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোডে অবস্থান নেয় পাথরবাহী ট্রাকের বিরুদ্ধে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। রাতভর চলা এই অভিযানে সাদাপাথরের পাথর উদ্ধার করা হয়। কয়েকটি ট্রাক থেকে পাথরের পাশাপাশি ক্রাশার মিলের ভাঙা পাথরও পাওয়া যায়। তল্লাশির পর আরও বেশ কিছু ট্রাক আটক করা হয়েছে এবং পাথর উদ্ধার করে সাদাপাথর এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আক্তার মিতা জানিয়েছেন, পাথর উত্তোলনের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযানের পর ৭০টি ট্রাক থেকে ৩৫,০০০ ফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে এবং অভিযান চলমান থাকবে।
এদিকে, সিলেটের ভোলাগঞ্জ ও জাফলং থেকে পাচার হওয়া পাথর বর্তমানে সড়ক পথের পরিবর্তে নৌপথে পাচার করা হচ্ছে। পিয়াইন ধলাই নদী ও স্থানীয় ভলগেটের আড়ালে এসব পাথর পাচারের কাজ চলছে। স্থানীয়দের দাবি, পাথর চুরির পর তা ঢাকায় পাঠানো হয় এবং কিছু অংশ স্থানীয় ক্রাশার মিল মালিকরা কিনেছেন।
দুর্ঘটনাজনিতভাবে পাথর লুটের ঘটনার সাথে এলাকার কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির নাম জড়িত হয়েছে। সাদাপাথর থেকে পাচার হওয়া পাথরের একটি বড় অংশ স্থানীয় ক্রাশার মিল মালিকদের কাছে বিক্রি হয়েছে। দুদকও এই বিষয়ে তদন্ত করছে এবং এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে।
এদিকে, সাদাপাথর এলাকা বর্তমানে পাথরশূন্য হয়ে পড়েছে। সিলেটের প্রশাসন এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা সারা রাতেরও বেশি সময় ধরে অভিযান চালাচ্ছেন এবং নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। তারা এলাকাটি পুনরায় পূর্বের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. শেখ মাহবুব মুরাদ সম্প্রতি ভোলাগঞ্জে সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শন করেন এবং সাদাপাথরের উদ্ধার করা পাথর পুনরায় সেখানে স্থাপন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি জানান, সাদাপাথরের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং যারা এর সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাদাপাথর লুটের ঘটনা দেশের পরিবেশ ও পর্যটন শিল্পের জন্য বিরাট বিপদ হতে পারে। প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আরও সচেতনতা ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ প্রয়োজন। শুধুমাত্র আইনগত পদক্ষেপ নয়, পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতির প্রতিকার এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপদ স্থান তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার।