Home বাংলাদেশ ঘটনা-দুর্ঘটনা কোম্পানীগঞ্জে সাদাপাথর লুটের টাকার ভাগ পেতেন ডিসি–এসপি

কোম্পানীগঞ্জে সাদাপাথর লুটের টাকার ভাগ পেতেন ডিসি–এসপি

Posted by on in বাংলাদেশ 0
1st Image

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে সাদাপাথর লুটপাট নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যে তদন্ত চালিয়েছে, তাতে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ৪২ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতাপাওয়া গেছে। তালিকায় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের নাম রয়েছে।

তদন্তে আরও দেখা যায়, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা, পুলিশ ও বিজিবির একাংশ লুটপাটে সরাসরি বাধা না দিয়ে উল্টো নানা উপায়ে সহযোগিতা করেছেন।

১৩ আগস্ট দুদকের উপপরিচালক রাফী মো. নাজমুস সাদাতের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি টিম সাদাপাথর এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানের পর প্রাপ্ত তথ্য ঢাকায় পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়—

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকার পাথর অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে লুটপাট বেড়ে যায় এবং গত তিন মাসে ব্যাপকভাবে চলে।
সর্বশেষ মাত্র ১৫ দিন আগে নির্বিচার পাথর উত্তোলন হয়েছে, যাতে প্রায় ৮০ শতাংশ পাথর খনন হয়ে যায়।
ফলে পুরো এলাকা এখন গর্ত আর বালুচরে পরিণত হয়েছে।

ঢাকায় পাঠানো দুদকের নথিতে লুটপাটকে ছয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। সেখানে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি), স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, রাজনীতিবিদ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে অভিযোগ আনা হয়েছে—

জেলা প্রশাসক (ডিসি), ইউএনও, এসপি, ওসি প্রভাবশালীদের কাছ থেকে কমিশন নিয়েছেন।
প্রতি ট্রাক থেকে ৫ হাজার টাকাএবং প্রতিটি বারকি নৌকা থেকে ৫০০ টাকাভাগ বণ্টন হতো।
প্রশাসন ও পুলিশ এই টাকা নির্দিষ্ট সোর্সের মাধ্যমে সংগ্রহ করত।
বিজিবির ক্যাম্প সাদাপাথর এলাকার একেবারে পাশে থাকলেও নিষ্ক্রিয় থেকেছে।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ৩১ জন রাজনৈতিক নেতাসরাসরি লুটপাটে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে—

  • বিএনপি: ২১ জন
  • জামায়াত: ২ জন
  • এনসিপি: ২ জন
  • আওয়ামী লীগ (নিষিদ্ধ কার্যক্রম): ৭ জন

এছাড়া স্থানীয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক সংগঠনের নেতা এবং অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এতে যুক্ত ছিলেন।

দুদকের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, “এটি একটি ষড়যন্ত্র, প্রকৃত দোষীদের আড়াল করতে আমাদের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।”

অন্যদিকে অভিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কেউ বলেছেন, “আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি,”আবার কেউ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী—

প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ৫০০ ঘনফুট পাথরতোলা হতো।
পরিবহনভাড়া বাদে প্রতি ট্রাকের বাজারমূল্য ধরা হতো প্রায় ৯১ হাজার টাকা।
এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা কমিশনযেত প্রশাসন ও পুলিশের কাছে, বাকি টাকা ভাগ হয়ে যেত লুটকারীদের মধ্যে।

কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর লুটপাট শুধু একটি অবৈধ খননকাণ্ড নয়, বরং এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির জটিল চক্রকে স্পষ্ট করেছে। দুদক জানিয়েছে, এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করতে নথি খোলার আবেদন করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—দোষীদের কি সত্যিই বিচারের মুখোমুখি করা হবে, নাকি সবকিছু আগের মতো চাপা পড়ে যাবে?