বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ ভরা মৌসুমে পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম আকাশছোঁয়া, অথচ এর মধ্যেই সরকার বিদেশে রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে—যা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উঠেছে সমালোচনার ঝড়।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ দেশের প্রধান মাছ বাজারগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে—এক কেজির কিছু কম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২,৩০০ থেকে ২,৫০০ টাকায়। মাঝারি সাইজের (৬০০–৯০০ গ্রাম) ইলিশও ১,৫০০–২,২০০ টাকার নিচে মিলছে না। অনেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এখন ইলিশ কিনতে গেলে মনে হয় যেন সোনার দামে মাছ কিনছি।"
সরকারি হিসাবে বলা হচ্ছে—২০০১ সাল থেকে দেশের ইলিশ উৎপাদনে ধারাবাহিক বৃদ্ধি ঘটেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ৩ লাখ টন, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫.৭১ লাখ টনে পৌঁছেছে। যদিও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কিছুটা কমে ৫.২৯ লাখ টনে নেমে আসে।
কিন্তু মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন—এই পরিসংখ্যান বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। চাঁদপুরের অভিজ্ঞ আড়তদার আক্কাছ মোল্লা বলেন, "নদীতে মাছ না থাকলে বাজারে আসবে কীভাবে? সরকার যা বলছে তা মাঠ পর্যায়ে আমরা টের পাচ্ছি না।" তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদনের সংখ্যা অনুমানভিত্তিক, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ হয় না।
চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার দূষিত পানি মেঘনা নদীর মোহনায় গিয়ে পড়ছে। ফলে ভরা মৌসুমেও পদ্মা-মেঘনায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়ছে না। পরিবেশগত সংকটকেই তাঁরা ইলিশ সংকটের বড় কারণ হিসেবে দেখছেন।
এই সংকটের মধ্যেই সৌদি আরবে ১১ হাজার টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। অক্টোবরের মধ্যে এ চালান পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তে অনেকেই বিস্মিত। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা জয় চন্দ্র বলেন, “দেশে যেখানে মানুষ ইলিশ কিনতেই পারছে না, সেখানে রপ্তানি করার সিদ্ধান্ত হাস্যকর। এটি সাধারণ মানুষের অনুভূতির প্রতি চরম অবহেলা।”
সরকারি পর্যায় থেকেও স্বীকার করা হয়েছে—চাঁদাবাজি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইলিশের দাম বেড়েছে। মৎস্য উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “সরবরাহ কম, তেলের দাম বেশি, নদী দূষিত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। তবে বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমবে বলে আশা করা যাচ্ছে।”
রপ্তানি বিষয়ে সরকারের ভাষ্য—বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সীমিত আকারে রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, যেখানে বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।