Home বাংলাদেশ রাজনীতি এক বছর পরও ‘পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি’ অধরা

এক বছর পরও ‘পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি’ অধরা

Posted by on in বাংলাদেশ 0
1st Image

"আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই"—এই স্লোগানকে সামনে রেখে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন একসময় গড়ায় সরকার পতনের আন্দোলনে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। শপথ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন একটি নতুন সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—পরিবর্তন কি আদৌ হয়েছে?

সরকার বদল, কিন্তু নীতির বদল নয়

নতুন সরকারের শুরুর দিকটায় জনমনে আশা জাগলেও, দ্রুতই সেই আশার জায়গা গড়ায় হতাশায়। যানজট, প্রশাসনিক দুর্নীতি, প্রটোকল সংস্কৃতি—সবই প্রায় একই রয়ে গেছে। পাসপোর্ট অফিসের দীর্ঘ লাইন, ড্রাইভিং লাইসেন্স জট, সরকারি দপ্তরগুলোতে ভোগান্তি—সবকিছুই যেন পুরনো দিনেরই প্রতিচ্ছবি।

বিশ্লেষক মাহা মির্জা বলেন, "ক্ষমতার পালাবদল হলেও পুরনো আমলাতান্ত্রিক অবকাঠামো অটুট রয়ে গেছে। সেই পুরনো 'স্যার কালচার', প্রটোকলভিত্তিক প্রশাসন—সবই চলছে একইভাবে।"

অভ্যুত্থান থেকে সুবিধাভোগে রূপান্তর?

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ ব্যক্তিরাই আজ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু উঠছে গুরুতর অভিযোগ—তারা জুলাই আন্দোলনকে ‘মানি মেকিং মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। যেমন, সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা নিজের ফেসবুক পোস্টে সরাসরি এই অভিযোগ তোলেন। আর গুলশানে চাঁদাবাজির ঘটনায় আটক হন আন্দোলনেরই এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।

শুধু তাই নয়, সরকারি অর্থে আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের বিভাগীয় সফর এবং কোটা ভিত্তিক পদবণ্টনের অভিযোগও রয়েছে। আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক হাসিবুর ইসলাম নাসিফ বলেন, “যারা আন্দোলনে মুখ দেখিয়েছিল, শুধু তারাই ছিল প্রাধান্যপ্রাপ্ত; বাকিদের মতামত কখনোই গণনায় ধরা হয়নি।”

দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার অব্যাহত

নতুন সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেও উঠে এসেছে নানা বিতর্ক। কুমিল্লায় একজন উপদেষ্টার বাবার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, এনসিটিবি-সংক্রান্ত কমিশন বাণিজ্য এবং সরকারি পদে প্রভাব খাটানোর মতো ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারের ভাবমূর্তি। দলীয়ভাবে কিছু ব্যক্তিকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হলেও, তা স্থায়ী সংস্কারের কোনো বার্তা দেয়নি।

অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, “নতুনরাও পুরনোদের পথেই হাঁটছেন। তারা যা শিখেছেন, তা-ই বাস্তবায়ন করছেন। তাই পরিবর্তনের প্রত্যাশা থেকেও বাস্তবে কিছুই বদলায়নি।”

নারী অধিকার ও বাস্তবতা: আশাবাদের বিপরীতে হতাশা

কোটা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয়, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাইয়ের রাতের প্রতিবাদে। কিন্তু এক বছর পর দেখা যাচ্ছে—হলগুলোর বৈষম্য, পোশাক ও চলাফেরায় হয়রানি এবং হেনস্তাকারীদের দায়মুক্তি—সবই চলছে আগের মতোই।

মাইশা মালিহা বলেন, “নারী অধিকার নিয়ে যে সংস্কারের কথা ছিল, বাস্তবে কিছুই হয়নি। বরং অপরাধীদের পুনর্বাসন করে উদাহরণ তৈরি করা হচ্ছে।”

দিকহীন অন্তর্বর্তী সরকার: ব্যর্থতার কারণ কী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছে। ফলে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার বা সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

মাহা মির্জা বলেন, “সমর্থন পেলেও সরকার সময়মতো শক্ত অবস্থান নেয়নি। সামাজিক সমস্যাগুলোর বিপরীতে তারা দুর্বল থেকেছে। ফলে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা যায়নি।”

সূত্র: বিবিসি বাংলা